কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ও ক্ষতিপূরণঃ শ্রমিক কী পাবেন? মালিক কী করবেন? — শ্রম আইনের সহজ ব্যাখ্যা

দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রদানে মালিকের দায়িত্ব (ধারা ১৫০)

চাকরি চলাকালীন বা কাজের কারণে কোনো দুর্ঘটনায় শ্রমিক আহত হলে মালিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য

তবে মালিক দায়মুক্ত হবেন যদি—

  • শ্রমিক আঘাতের ফলে ৩ দিনের বেশি কর্মক্ষমতা না হারান
  • দুর্ঘটনার সময় শ্রমিক মদ্যপ বা মাদকাসক্ত থাকেন
  • শ্রমিক ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তা বিধি অমান্য করেন বা PPE ব্যবহার না করেন

👉 গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ তফসিলে উল্লেখিত পেশাগত রোগ (Occupational Disease)-কেও দুর্ঘটনাজনিত জখম হিসেবে গণ্য করা হবে

⚠️ আইনি দ্বন্দ্ব এড়াতেঃ

  • দেওয়ানি আদালতে মামলা করলে এই আইনে ক্ষতিপূরণ মিলবে না
  • শ্রম আদালতে গেলে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে না

ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ (ধারা ১৫১)

জখমের ধরন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ভিন্ন হবে—

  • মৃত্যু: পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত অর্থ ২,০০,০০০/- টাকা
    (
    এটি ছাঁটাই/বরখাস্ত/অবসান/চাকুরী পদত্যাগের পাওনার অতিরিক্ত)
  • স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতা: পূর্ণ নির্ধারিত অর্থ ২,৫০,০০০/- টাকা।
  • স্থায়ী আংশিক অক্ষমতা: উপার্জন ক্ষমতা হানির শতাংশ অনুযায়ী
    • ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে আক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত, কিন্তু সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত
      (যেমন: কেউ ৬ মাস অক্ষম থাকলে, ৬ মাস পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু যদি অক্ষমতা ১ বছরের বেশি হয়, তাহলে শুধু ১ বছর পর্যন্ত দেওয়া হবে।)
    • প্রথম ২ মাসের জন্য — শ্রমিকের পুরো মাসিক মজুরি দেওয়া হবে।
    • পরের ২ মাসের জন্য — মাসিক মজুরির দুই-তৃতীয়াংশ দেওয়া হবে।
    • তারপরের মাসগুলোর জন্য — মাসিক মজুরির অর্ধেক দেওয়া হবে।

কর্মস্থল দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল/EIS Fund (ধারা ১৫১ক)

সরকার নির্ধারিত শিল্পের জন্য একটি বিশেষ তহবিল (EIS Fund) গঠন করতে পারে
এই তহবিলে চাঁদা দিলে—

  • মালিকের সরাসরি ক্ষতিপূরণ দায় প্রযোজ্য হবে না
  • শ্রমিক তহবিল থেকেই সুবিধা পাবেন

মাসিক মজুরি হিসাবের পদ্ধতি (ধারা ১৫২)

ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে—

  • দুর্ঘটনার আগের পূর্ববর্তী ১২ মাসের মোট মজুরীর গড় ধরতে হবে
  • যদি ১ মাসের কম কাজ করেন, তাহলে সমজাতীয় শ্রমিকের গড় আয় বিবেচ্য

মাসিক ক্ষতিপূরণ এককালীন পরিশোধ সংক্রান্ত (ধারা ১৫৪)

  • মালিক ও শ্রমিকের চুক্তির ভিত্তিতে মাসিক ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে এককালীন (থোক) অর্থ পরিশোধ করা যেতে পারে
  • যদি কোনো চুক্তি না হয় এবং অন্তত ৬ মাস মাসিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তবে যে কোনো পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে শ্রম আদালত নির্ধারিত এককালীন অর্থ পরিশোধ করে তা নিষ্পত্তি করা যেতে পারে

ক্ষতিপূরণ বণ্টন (ধারা ১৫৫)

  • জখমের কারনে মৃত্যু বা আইনগত অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ শ্রম আদালতে জমা দিতে হবে (ফরম ৪৫ ও ৪৬ এর মাধ্যমে, বাংলাদেশ শ্রম বিধি-১৩৭)
  • মনোনীত উত্তরাধিকারীকে প্রদান করা হলে বৈধ হবে
  • দাফন বা চিকিৎসা খরচ দেওয়া হলে ক্ষতিপূরণ থেকে কাটা যাবে না
  • আদালত জমাকৃত অর্থ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ন্যায্য বণ্টন করবে

ক্ষতিপূরণ হস্তান্তরের বাধা (ধারা ১৫৬)

ক্ষতিপূরণের টাকা—

  • হস্তান্তরযোগ্য নয়
  • ক্রোক বা দায়বদ্ধ করা যাবে না

শ্রম আদালতে ক্ষতিপূরণের দাবি বিবেচনা (ধারা ১৫৭)

শ্রম আদালত ক্ষতিপূরনের কোন দাবি বিবেচনায় আনিবে না, যদি-

  • দুর্ঘটনার ঘটার পর দ্রুত শ্রম আদালতে নোটিশ না দেওয়া হয়
  • ২ বছরের মধ্যে শ্রম আদালতে অর্থ দাবি না করা হয়

মারাত্মক দুর্ঘটনার রিপোর্ট (ধারা ১৫৮ ও ১৫৯)

  • শ্রমিক মারা গেলে আদালত ব্যাখ্যা চাইতে পারে
  • মালিককে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে

চিকিৎসা পরীক্ষা (ধারা ১৬০)

  • মালিকের খরচে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা
  • শ্রমিক অস্বীকার করলে ক্ষতিপূরণ স্থগিত হতে পারে
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url