বাংলাদেশের শ্রম আইনে চিকিৎসা কক্ষ ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাধ্যতামূলক বিধান
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা সেবার মান ও পরিধি নির্ধারিত হয়। মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে ধারণা দেওয়া হলোঃ
১.
বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র ও ডিসপেনসারি (ধারা-৮৯)
·
৫০০+ শ্রমিকঃ যে সকল প্রতিষ্ঠানে ৫০০ বা তার বেশি শ্রমিক নিযুক্ত আছেন, সেখানে নির্ধারিত মাপের সরঞ্জামসহ একটি
সুসজ্জিত ডিসপেনসারি এবং একটি চিকিৎসা কক্ষ (Doctor Room) থাকতে হবে।
·
পেশাদার স্টাফঃ এই চিকিৎসা কক্ষটি নির্ধারিত চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফের
তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে হবে।
·
৫০০০+ শ্রমিকঃ যখন শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০০ বা তার বেশি হয়, তখন সেখানে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্য কেন্দ্র
(Health Centre) পরিচালনা করা
মালিকের আইনি দায়িত্ব।
২.
চিকিৎসা কক্ষ (Medical
Room) স্থাপন (বিধি-৭৭)
প্রতিটি কারখানায় একটি
সুসজ্জিত চিকিৎসা কক্ষ থাকতে হবে। এর প্রধান শর্তগুলো হলোঃ
- জনবলঃ
কমপক্ষে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এবং তাকে সহায়তার জন্য দক্ষ
কম্পাউন্ডার/নার্স থাকতে হবে।
- শ্রমিক সংখ্যা ৩০০০+ হলেঃ অন্তত ২ জন
রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স নিয়োগ দিতে হবে।
- শিফট ভিত্তিক নিয়মঃ তিন শিফটে কাজ
চললে, রাতের
শিফটে চিকিৎসকের পরিবর্তে ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকবে।
·
অবস্থান ও অবকাঠামোঃ চিকিৎসা কক্ষটি কোলাহলমুক্ত স্থানে হতে হবে। মেঝে মসৃণ ও
দেয়াল ১.৫০ মিটার পর্যন্ত অভেদ্য (Vitrified/Tiled)
হতে
হবে। রোগী কক্ষের নকশা মহাপরিদর্শক বা তদ্কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শকের অনুমোদন
নিতে হবে।
৩.
পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (Health Centre) স্থাপন (বিধি-৭৮)
যখন একই মালিকানাধীন এক
বা একাধিক প্রতিষ্ঠান একই স্থানে অবস্থিত এবং শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০০ বা তার বেশি হয়, তখন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য কেন্দ্র
স্থাপন করতে হবে।
- ৫০০০ - ৭৫০০ শ্রমিকঃ ন্যূনতম ২ জন
রেজিস্টার্ড চিকিৎসক।
- ৭৫০১+ শ্রমিকঃ ন্যূনতম ৩ জন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক।
- অন্যান্য স্টাফঃ প্রতি চিকিৎসকের জন্য ১
জন প্রশিক্ষিত নার্স এবং ১ জন
যোগ্যতাসম্পন্ন ড্রেসার থাকবে।
- গুরুত্বপূর্ণঃ একাধিক চিকিৎসক
নিয়োগ থাকলে অন্ততপক্ষে ১ জন মহিলা চিকিৎসক নিয়োগের চেষ্টা করতে
হবে।
·
শয্যা সংখ্যাঃ
স্বাস্থ্য
কেন্দ্রে কমপক্ষে ৬টি শয্যা (Bed)
থাকতে
হবে। ৫০০০-এর বেশি প্রতি ১০০০ শ্রমিকের জন্য ১টি করে অতিরিক্ত শয্যা যোগ করতে হবে। প্রতিটি শয্যার জন্য ৩.৩ বর্গমিটার জায়গা বরাদ্দ করতে হবে।
- বিশেষ সুবিধাঃ নারী ও পুরুষদের
জন্য পৃথক শয্যা, শৌচাগার ও
প্রস্রাব কক্ষসহ সংক্রামক ব্যাধির জন্য আলাদা কক্ষ, ওষধ রাখার স্টোর, ছোট
অস্ত্রোপচার কক্ষ (OT),
ফ্যামিলি প্ল্যানিং পরামর্শ এবং প্রসূতি কল্যাণ সেবা থাকতে হবে।
৪. উন্নত
চিকিৎসা ও জরুরি পরিবহন
- অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাঃ গুরুতর দুর্ঘটনা
বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে শ্রমিককে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নিজস্ব উপযুক্ত
পরিবহনের (অ্যাম্বুলেন্স) ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- হাসপাতালের সাথে চুক্তিঃ কারখানার গেটে বা
নোটিশ বোর্ডে নিকটস্থ চুক্তিভুক্ত হাসপাতালের নাম ও ঠিকানা প্রদর্শন করতে হবে
যাতে জরুরি অবস্থায় শ্রমিকরা সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়।
৫.
রেকর্ড সংরক্ষণ ও পরিদর্শন
- প্রতিটি চিকিৎসা সেবা বা দুর্ঘটনার বিস্তারিত রেকর্ড
রেজিস্টারে সংরক্ষণ করতে হবে।
- সরকার নির্ধারিত পরিদর্শক যখনই চাইবেন, এই রেকর্ডগুলো
তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
৬.
বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা
- প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করার মতো জায়গা না থাকলে মালিক মহাপরিদর্শক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শকের অনুমতিক্রমে নিকটবর্তী হাসপাতালে সহিত লিখিত চুক্তির মাধ্যমে
বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন।
অনেক প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র ফার্স্ট এইড বক্স রেখেই দায়িত্ব শেষ মনে করে, কিন্তু শ্রমিক সংখ্যা ৫০০ বা তার বেশি হলেই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কক্ষের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় (শ্রম আইন অনুযায়ী)। এটি নিশ্চিত করলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং আইনি জটিলতা এড়ানো যায়।