শিল্প-প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে 'সেইফটি কমিটি' গঠন, ক্ষমতা ও দায়িত্বঃ নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের আইনি নির্দেশনা
১. সেইফটি কমিটি গঠন (বিধি-৮১)
যে সকল
কারখানায় ৫০ জন বা তার বেশি শ্রমিক নিয়োজিত থাকেন, সেখানে মালিককে অবশ্যই একটি 'সেইফটি
কমিটি' গঠন করতে হবে।
- সময়সীমাঃ বিদ্যমান
কারখানার ক্ষেত্রে বিধিমালা জারির ৬ মাসের মধ্যে এবং নতুন কারখানার ক্ষেত্রে
উৎপাদন শুরুর ৯ মাসের মধ্যে এই কমিটি গঠন করতে হবে।
- সদস্য সংখ্যাঃ কমিটির
মোট সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন ৬ জন এবং সর্বোচ্চ ১২ জন হতে
হবে।
- সমান প্রতিনিধিত্বঃ কমিটিতে
মালিক এবং শ্রমিক পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক প্রতিনিধি থাকতে হবে।
- পদবিঃ কমিটিতে
একজন সভাপতি,
একজন সহ-সভাপতি এবং একজন সদস্য-সচিব থাকবেন।
২. কমিটির কাঠামো ও নির্বাচন পদ্ধতি
- সদস্য-সচিবঃ কমিটির
প্রথম সভায় সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে একজন সদস্য-সচিব নির্বাচন করবেন। তবে
কারখানায় যদি ইতিমধ্যে কোনো 'নিরাপত্তা কর্মকর্তা' (Safety Officer) থাকেন, তবে তিনি পদাধিকার বলে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং কমিটির সদস্য-সচিব
হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
- মনোনয়নঃ সভাপতি
ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের মালিক মনোনীত করবেন। সহ-সভাপতি এবং শ্রমিক
প্রতিনিধিদের সিবিএ (CBA)
বা অংশগ্রহণকারী কমিটি (Participation Committee)
মনোনীত করবে।
- নারী শ্রমিকঃ প্রতিষ্ঠানে
যদি অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী শ্রমিক থাকে, তবে কমিটির শ্রমিক
প্রতিনিধিদের মধ্যেও অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী হতে হবে।
৩. শ্রমিকের সংখ্যা অনুযায়ী কমিটির সদস্য বিন্যাস
শ্রমিকের
সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কমিটির সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হয়ঃ
| শ্রমিকের
সংখ্যা | কমিটির
মোট সদস্য (সর্বোচ্চ) |
| ৫০ থেকে
৫০০ জন | ৬ জন |
| ৫০১ থেকে
১০০০ জন | ৮ জন |
| ১০০১
থেকে ৩০০০ জন | ১০ জন |
| ৩০০১ বা
তদূর্ধ্ব | ১২ জন |
৪. পদ শূন্য হওয়া ও পূরণ (বিধি-৮২)
যদি কোনো
সদস্য পদত্যাগ করেন,
অবসরে যান বা মারা যান, তবে মালিকপক্ষ বা শ্রমিকপক্ষ
(সিবিএ/অংশগ্রহণকারী কমিটি) তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি নতুন করে মনোনীত করবেন।
কমিটির কোনো পরিবর্তন হলে তা ১৫ দিনের মধ্যে মহাপরিদর্শককে জানাতে হবে।
৫. কমিটির মেয়াদ ও বিশেষ বিধান (বিধি-৮৩ ও ৮৪)
- মেয়াদঃ কমিটির
মেয়াদ হবে প্রথম সভার তারিখ হতে ২ (দুই) বছর।
- পুনর্গঠনঃ বর্তমান
কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৪৫ দিন আগে পরবর্তী নতুন কমিটি গঠন করতে হবে।
- বিশেষ বিধানঃ ৫০
জনের কম শ্রমিক আছে এমন ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে পেশাগত স্বাস্থ্য ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই বিধি অনুসরণ করতে পারে।
১. সেইফটি কমিটির কার্যপরিধি (Scope of Work)
একটি
সেইফটি কমিটির মূল কাজগুলো হলোঃ
- আইন বাস্তবায়নে সহায়তাঃ প্রতিষ্ঠানের
পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়নে মালিককে
সহায়তা করা।
- ঝুঁকি চিহ্নিতকরণঃ নির্দিষ্ট
চেকলিস্ট অনুযায়ী কারখানার ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা এবং তা দূর করতে মালিককে
সুপারিশ করা।
- সচেতনতা ও প্রশিক্ষণঃ শ্রমিক
ও কর্মকর্তাদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং
সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
- দুর্ঘটনা প্রতিরোধঃ কারখানায়
অগ্নিনির্বাপণ,
উদ্ধার এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দল গঠন ও মহড়া পরিচালনায়
তদারকি করা।
- পরিদর্শন ও তদারকিঃ নিরাপত্তা
ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং পরিদর্শকদের পরিদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয়
রিপোর্ট ও রেকর্ড প্রস্তুত রাখা।
- জাতীয় কাউন্সিলের সহায়তাঃ 'জাতীয়
শিল্প, স্বাস্থ্য ও সেইফটি কাউন্সিল' প্রণীত নীতি ও নির্দেশিকা
বাস্তবায়নে মালিককে সাহায্য করা।
২. সভা আয়োজন ও কার্যবিবরণী (Meetings)
কমিটির
কার্যক্রম গতিশীল রাখতে সভার গুরুত্ব অপরিসীমঃ
- সভার ব্যবধানঃ সেইফটি
কমিটির সভা প্রতি ৩ (তিন) মাসে ন্যূনতম একবার আয়োজন করতে হবে। তবে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময় সভা ডাকা যাবে।
- আলোচ্য বিষয়ঃ সভায়
পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রিপোর্ট, ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং আগের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা
করতে হবে।
- সংরক্ষণঃ সভার
কার্যবিবরণী (Minutes)
অবশ্যই লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং কল-কারখানা
পরিদর্শন অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী তা প্রদর্শন করতে হবে।
৩. সেইফটি কমিটির বিশেষ এখতিয়ার ও অধিকার (Authority)
আইন
অনুযায়ী কমিটিকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে:
- অভিযোগ পেশঃ কমিটির
সুপারিশ অনুযায়ী মালিক যদি ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না নেন, তবে কমিটি সরাসরি
মহাপরিদর্শকের নিকট লিখিত অভিযোগ পেশ করতে পারবে।
- বিশেষ প্রতিবেদনঃ জরুরি
প্রয়োজনে কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের স্বাক্ষরে মালিকের কাছে যেকোনো সময়
বিশেষ প্রতিবেদন দাখিল করা যায়।
- কারখানা পরিদর্শনঃ কমিটির
সদস্যরা প্রয়োজনে কারখানা খোলা বা বন্ধ অবস্থায় যেকোনো সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা
পরিদর্শন করতে পারবেন এবং মালিক এক্ষেত্রে সহায়তা করতে বাধ্য।
- সময় প্রদানঃ কমিটির
সদস্যদের প্রশিক্ষণ বা সভায় অংশগ্রহণের জন্য মালিককে প্রয়োজনীয় সময়
(কর্মঘণ্টার মধ্যে) প্রদান করতে হবে।
৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়বদ্ধতা
- সিদ্ধান্তঃ কমিটির
সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ ঐকমত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গৃহীত হতে হবে।
- ব্যক্তিগত দায়মুক্তিঃ কমিটির
কোনো সিদ্ধান্তের জন্য বা সরল বিশ্বাসে গৃহীত কোনো কাজের জন্য কোনো সদস্যকে
ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যাবে না।
- খরচঃ কমিটির
কার্যক্রম পরিচালনার যাবতীয় খরচ মালিক পক্ষ বহন করবে।
অনেক
ক্ষেত্রে দেখা যায়,
কমিটি গঠন করা হলেও নিয়মিত সভা হয় না বা সভার সিদ্ধান্তগুলো
বাস্তবায়ন করা হয় না। মনে রাখবেন, মালিক পক্ষ যদি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৭ দিনের মধ্যে উদ্যোগ না নেয়, তবে কমিটির সরাসরি ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার অধিকার রয়েছে। এটি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার
একটি শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা।