বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী মজুরী পরিশোধ ও কর্তনের বিস্তারিত
আজকের আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশ শ্রম আইনের দশম অধ্যায় এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালার দশম অধ্যায় নিয়ে। মজুরী আসলে কত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয় বা মজুরী থেকে কি কর্তন করা যায় সে সম্পর্কে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও উপধারার সহজ ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলোঃ
সঙ্গা
অনুসারে মজুরী আসলে কী?
সহজ
কথায়, একজন শ্রমিক তার চাকরির শর্ত অনুযায়ী কাজ
করার বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে টাকা হিসেবে যে পারিশ্রমিক পান, তা-ই মজুরী । এর
মধ্যে আপনার নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমনঃ
- নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী পাওয়া কোনো বোনাস
বা অতিরিক্ত টাকা ।
- ছুটি, বন্ধের
দিন কাজ বা ওভারটাইম (অধিকাল) করার পারিশ্রমিক ।
- চাকরি থেকে অবসর, ছাঁটাই, পদত্যাগ বা বরখাস্ত হলে
আইন অনুযায়ী প্রদেয় অর্থ ।
- লে-অফ বা সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকা
অবস্থায় পাওয়া টাকা ।
যে বিষয়গুলি
মজুরীর অন্তর্ভুক্ত নয়
আইন
অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধাকে মজুরী বলা যাবে না। নিচের সুবিধাগুলো মজুরীর হিসাব থেকে
বাদ যাবেঃ
- মালিক যদি বাসস্থান, আলো, পানি বা চিকিৎসা সুবিধা
প্রদান করেন, তবে তার মূল্য মজুরী হিসেবে গণ্য হবে না ।
- অবসর ভাতা বা প্রভিডেন্ট ফান্ডে
মালিকের দেওয়া কোনো চাঁদা ।
- যাতায়াতের জন্য দেওয়া কোনো কনসেশন বা
ভাতা ।
- কাজের প্রকৃতির কারণে কোনো বিশেষ খরচ
বহন করার জন্য যদি বাড়তি অর্থ দেওয়া হয়।
১২০ ধারা
মোতাবেক মজুরীর সঙ্গা
এই
ধারায় মজুরীর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মজুরীর পাশাপাশি নিচের পাওনাগুলোও ‘মজুরী’
হিসেবে গণ্য হবেঃ
- চাকরির শর্ত অনুযায়ী প্রদেয় বোনাস বা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ।
- ছুটি, সরকারি বন্ধ বা ওভারটাইম (অধিকাল) কাজের জন্য প্রাপ্য অর্থ ।
- আদালতের আদেশ বা দুই পক্ষের মধ্যে
কোনো আপোসের মাধ্যমে নির্ধারিত পারিশ্রমিক ।
- চাকরির অবসান হলে (যেমনঃ ছাঁটাই, ডিসচার্জ, পদত্যাগ বা অবসর) আইন অনুযায়ী প্রদেয় অর্থ ।
- লে-অফ বা সাময়িক বরখাস্তের কারণে প্রদেয় অর্থ ।
মজুরী পরিশোধের দায়িত্ব (ধারা ১২১)
- মালিক ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিকদের মজুরী
পরিশোধের জন্য দায়ী থাকবেন ।
- প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, ব্যবস্থাপক বা মালিকের প্রতিনিধিও এই দায়িত্ব পালন করবেন ।
- ঠিকাদারের শ্রমিকের ক্ষেত্রেঃ
ঠিকাদার মজুরী না দিলে মূল মালিককে তা দিতে হবে এবং
মালিক পরবর্তীতে ঠিকাদারের পাওনা থেকে তা কেটে নিতে পারবেন ।
মজুরীকাল ও পরিশোধের সময়সীমা (ধারা ১২২ ও ১২৩)
- কোনো মজুরীকালই ১ মাসের বেশি হবে না
- মজুরী পরিশোধঃ মজুরীকাল শেষ হওয়ার পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের
মধ্যে
মজুরী দিতে হবে ।
- চাকরি অবসানঃ
কোনো শ্রমিক অবসরে গেলে বা তাকে ছাঁটাই/ডিসচার্জ করা
হলে, তার পাওনা চাকরি অবসানের ৩০ কর্মদিবসের
মধ্যে
পরিশোধ করতে হবে ।
- মজুরী অবশ্যই কর্মদিবসে পরিশোধ করতে হবে ।
মজুরী
পরিশোধের পদ্ধতি (ধারা ১২৪ ও ১২৪ক)
- নগদ টাকা, কারেন্সী নোট বা ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে মজুরী দিতে হবে ।
- শ্রমিকের চাহিদা অনুযায়ী ডিজিটাল পদ্ধতিতে (বিকাশ/নগদ/ব্যাংক ট্রান্সফার) সরাসরি পরিশোধ করা যাবে ।
- পাওনা নিয়ে বিরোধ হলে মহাপরিদর্শকের
কাছে আবেদন করা যাবে। তিনি ২০ দিনের মধ্যে মালিক-শ্রমিক বৈঠকের
মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেবেন ।
মজুরী থেকে কর্তন (ধারা ১২৫ - ১৩১)
আইন
অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু কারণ ছাড়া শ্রমিকের মজুরী থেকে কর্তন
করা নিষিদ্ধ। অনুমোদিত কর্তনগুলো হলোঃ
- জরিমানাঃ
আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধের জন্য আরোপিত জরিমানা ।
- অনুপস্থিতিঃ
কাজে উপস্থিত না থাকলে সেই সময়ের মজুরী কর্তন ।
- ক্ষতিপূরণঃ
শ্রমিকের অবহেলার কারণে মালিকের মালামাল নষ্ট হলে
(তদন্ত সাপেক্ষে) ।
- সুবিধাঃ
মালিক প্রদত্ত বাসস্থান বা অনুমোদিত সেবার জন্য ।
- অগ্রিম ও ঋণঃ
আগে নেওয়া অগ্রিম বা ঋণের কিস্তি সমন্বয় ।
- অন্যান্যঃ
আয়কর, প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF), সমবায় সমিতির চাঁদা বা বীমা স্কিম।
- যদি ১০ বা তার বেশি শ্রমিক একসাথে
বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থাকেন, তবে মালিক অতিরিক্ত ৮ দিনের মজুরী কেটে নিতে পারেন ।
মৃত বা নিখোঁজ শ্রমিকের পাওনা (ধারা ১৩১)
- শ্রমিক মারা গেলে বা নিখোঁজ হলে তার
পাওনা
মনোনীত ব্যক্তি বা আইনগত উত্তরাধিকারীকে দিতে হবে
।
- যদি দাবীদার না আসে, তবে ১২ মাস পর ওই টাকা 'শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল'-এ জমা দিতে হবে ।
পাওনা আদায়ের আইনি পদক্ষেপ (ধারা ১৩২ - ১৩৭)
- মজুরী না পেলে বা অবৈধভাবে কেটে নিলে
শ্রমিক নিজে বা তার উত্তরাধিকারী শ্রম আদালতে আবেদন করতে পারেন ।
- ঘটনা সংগঠনের ১২ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে ।
- শ্রম আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আপীল করা
যাবে
।
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর মজুরি পরিশোধ ও
সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি বিধি ১১১ থেকে ১২০ পর্যন্ত যা বলা
হয়েছেঃ
১. মজুরি পরিশোধ (বিধি ১১১)
·
প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ফরম-৩৮
অনুযায়ী একটি মজুরি পরিশোধ রেজিস্টার (Register) সংরক্ষণ করতে হবে।
·
মজুরি প্রদানের সময় শ্রমিকের
স্বাক্ষর বা টিপসই নিতে হবে।
·
যদি কোনো শ্রমিক ব্যাংক বা
চেকের মাধ্যমে মজুরি নিতে চান, মালিককে সেই ব্যবস্থা করতে হবে এবং মহিলা
শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে সহায়তা করতে হবে।
·
প্রতিটি মজুরি মেয়াদে শ্রমিককে
ফরম-৩৮ অনুযায়ী একটি পে-স্লিপ দিতে হবে যেখানে মূল মজুরি, ওভারটাইম
এবং কর্তনের বিস্তারিত থাকবে।
·
যেসব ক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত
কোনো নিম্নতম মজুরি কাঠামো নেই, সেখানে একজন শ্রমিকের মূল
মজুরি
কোনোভাবেই তার মোট (Gross) মজুরির ৫০% এর কম হতে পারবে না এবং বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার তার মূল মজুরির (Basic
Salary) ৫% এর কম হতে পারবে না।
মজুরি পরিশোধের নোটিশ (বিধি ১১২)
·
মজুরি মাসিক, সাপ্তাহিক
বা দৈনিক যেভাবেই নির্ধারিত হোক না কেন, তা পরিশোধের উপায় ও সময় আগেই
নোটিশের মাধ্যমে জানাতে হবে।
·
মালিককে অন্তত ১০ দিন আগে
বাংলা ভাষায় সহজবোধ্য নোটিশ প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে বা দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে
দিতে হবে।
·
যদি বিশেষ প্রয়োজনে তারিখ
পরিবর্তন করতে হয়,
তবে নির্ধারিত তারিখের অন্তত ৩ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে।
মজুরি ও পাওনাদি নিয়ে আপোষ-মীমাংসা (বিধি ১১৩)
·
কোনো শ্রমিকের পাওনা
বেআইনিভাবে কর্তন করা হলে শ্রমিক নিজে বা ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে মালিককে
লিখিতভাবে জানাতে পারবেন।
·
মালিক অভিযোগ পাওয়ার ১০ দিনের
মধ্যে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন।
·
মালিক ব্যর্থ হলে মহাপরিদর্শক (DIFE) বা
ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শকের কাছে আবেদন করা যাবে।
পরিদর্শক সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ নেবেন এবং ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত
দেবেন।
·
আপোষ-মীমাংসার সিদ্ধান্তে কোনো
পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে ৬ মাসের মধ্যে শ্রম আদালতে আবেদন করতে পারবেন।
অসম্পূর্ণ মাস গণনা ও অনুপস্থিতির মজুরি হিসাব (বিধি ১১৪ ও ১১৫)
·
যদি কোনো শ্রমিক মাসের মাঝখানে
যোগ দেন বা চাকরি ছাড়েন,
তবে তার পাওনা হিসাব করতে ওই মাসের মোট (Gross) মজুরীকে উক্ত মাসের মোট
দিন দিয়ে ভাগ করে কর্মদিবস দিয়ে গুণ করতে হবে।
·
কোনো শ্রমিক বিনা অনুমতিতে
অনুপস্থিত থাকলে তার মূল মজুরিকে ৩০ দিয়ে ভাগ করে দৈনিক মজুরি বের করে অনুপস্থিতিরি
দিন দিয়ে গুন করতে হবে।
কর্তন
ও আদায়ের রেকর্ড সংরক্ষণ (বিধি ১১৬)
·
মজুরি কর্তন ও আদায়ের রেকর্ড
ফরম-৩৯ অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রতি বছর ১৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার
বিবরণী হলে মহাপরিদর্শক (DIFE) বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পরিদর্শকের কাছে জমা দিতে হবে।
অগ্রিম মজুরি (বিধি ১১৭)
·
পরবর্তী ২ মাসে শ্রমিক যে
পরিমাণ মজুরি অর্জন করবেন,
তার বেশি অগ্রিম দেওয়া যাবে না। এই অগ্রিম সর্বোচ্চ ১২
কিস্তিতে আদায় করতে হবে এবং কিস্তির পরিমাণ মাসিক মজুরির এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে
না।
মৃত শ্রমিকের পাওনা ও আদালতে জমা (বিধি ১১৮ ও
১১৯)
·
প্রত্যেক শ্রমিককে তার পাওনা
গ্রহণের জন্য ফরম-৪১ অনুযায়ী একজনকে মনোনীত (Nominee) করতে হবে।
·
যদি কোনো শ্রমিকের কোনো
উত্তরাধিকারী বা মনোনীত ব্যক্তি না থাকে, তবে মালিক সেই টাকা ফরম-৪২
অনুযায়ী শ্রম আদালতে জমা দেবেন। আদালত এই টাকা প্রাপ্তির রসিদ ফরম-৪৩ অনুযায়ী
প্রদান করবে।