প্রসূতি কল্যান সুবিধাঃ ঠিক কতদিন ছুটি, কত টাকা, আর কখন দিতে হবে—আইন কী বলে?
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ৪৫ – ৫০ অনুসারে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা (Maternity Benefit) সম্পর্কিত নিয়মাবলী মূলত নারী শ্রমিকদের অধিকার, ছুটির নিয়ম, এবং আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ
১. প্রসুতি কল্যান
সঙ্গাঃ
কোন নারী
শ্রমিককে তার প্রসূতি বা মা হওয়ার কারণে প্রদেয় মজুরীসহ ছুটি ও বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য
সুবিধ। সঙ্গা অনুযায়ী এই ছুটির
সময়ে তিনি কাজ না করলেও তার বেতন বা মজুরি পাবেন, সাথে প্রসূতি কল্যান সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ,
এটি বেতনসহ ছুটি (Paid
Leave)।
২.
ছুটি ও কর্মে নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা
আইন অনুযায়ী
সন্তান প্রসবের সময়টিতে নির্দিষ্ট কিছু দিন কাজ করা নিষেধ এবং এই সময়টি ছুটির
অন্তর্ভুক্তঃ
- প্রসবের পরবর্তী সময়ঃ সন্তান
প্রসবের ঠিক পরের
৬০ দিন (প্রায় ২ মাস) মালিক কোনো
নারী শ্রমিককে দিয়ে কাজ করাতে পারবেন না এবং নারী শ্রমিক নিজেও কাজ করতে
পারবেন না।
- ঝুঁকিপূর্ণ কাজঃ সন্তান
প্রসবের ১০ সপ্তাহ আগে থেকে সন্তান হওয়ার ১০ সপ্তাহ পর পর্যন্ত এমন কোনো কাজ
করানো যাবে না যা দাঁড়িয়ে করতে হয় বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
৩.
প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা
একজন নারী শ্রমিক
মালিকের কাছ থেকে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা (টাকা ও ছুটি) পাবেন যদিঃ
- তিনি সন্তান প্রসবের আগে ওই প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৬
(ছয়) মাস
কাজ করে থাকেন।
- যদি সন্তান প্রসবের সময় ওই নারীর ইতিমধ্যে দুই
বা ততোধিক সন্তান জীবিত থাকে,
তবে তিনি আর্থিক সুবিধা পাবেন না,
কিন্তু ছুটি পাওয়ার অধিকার বহাল থাকবে।
৪. নোটিশ প্রদানের নিয়ম (ধারা ৪৭)
- প্রসবের আগেঃ একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী যেকোনো দিন
মালিককে মৌখিক বা লিখিতভাবে জানাবেন যে, আগামী ৬০ দিনের
মধ্যে তার সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা আছে। নোটিশে তার মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই
সুবিধা কে পাবেন, সেই ব্যক্তির নামও উল্লেখ করতে হবে।
- প্রসবের পরেঃ যদি আগে নোটিশ দেওয়া না হয়ে
থাকে, তবে সন্তান প্রসবের পর ৭ দিনের মধ্যে মালিককে অবহিত করতে
হবে।
৫.
ছুটি মঞ্জুর করার পদ্ধতি
নোটিশ পাওয়ার পর
মালিক নিচের নিয়ম অনুযায়ী ছুটি দেবেনঃ
- যদি সন্তান হওয়ার আগে নোটিশ দেন, তবে নোটিশ
দেওয়ার পরের দিন থেকে তাকে
১২০ দিনের ছুটি দেওয়া হবে।
- যদি সন্তান হওয়ার পরে নোটিশ দেন, তবে সন্তান
প্রসবের তারিখ থেকে মোট
১২০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করা হবে।
৬. ছুটি বন্টনঃ
সন্তান প্রসবের পূর্ববর্তী
৬০ দিন এবং
পরবর্তী ৬০ দিন।
৭.
আর্থিক সুবিধা গণনা করার নিয়ম এবং পরিশোধের মাধ্যম
- দৈনিক গড় মজুরি বের করার জন্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের
সর্বশেষ প্রাপ্ত
মাসিক মোট মজুরিকে (Gross Wage) ২৬
দিয়ে ভাগ করতে হবে।
- টাকাঃ
এই সুবিধা এখন শুধু নগদে নয়,
ব্যাংক হিসাব বা ইএফটি (EFT) এর মাধ্যমেও
দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৮. টাকা বা সুবিধা
পরিশোধের ৩টি পদ্ধতি
মালিক নারীর
ইচ্ছা অনুযায়ী নিচের যে কোনো একটি পদ্ধতিতে টাকা পরিশোধ করবেনঃ
যদি ডাক্তার সার্টিফিকেট দেন যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সন্তান হবে, তবেঃ
- সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রসবের আগের ৬০ দিনের টাকা দিয়ে
দিতে হবে।
- বাকি টাকা সন্তান প্রসবের
প্রমাণ দেখানোর পরবর্তী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে
দিতে হবে।
· নারী যদি সন্তান প্রসবের প্রমাণ নিয়ে আসেন, তবেঃ
- প্রমাণ দেখানোর ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রসবের আগের ৬০ দিনের টাকা দিতে
হবে।
- অবশিষ্ট মেয়াদের টাকা
পরবর্তী ৮ সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
· সন্তান প্রসবের প্রমাণ দেখানোর ৩ কর্মদিবসের মধ্যে পুরো সময়ের (১২০ দিনের) টাকা একসাথে দিয়ে দিতে পারেন।
- সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রসবের আগের ৬০ দিনের টাকা দিয়ে
দিতে হবে।
ঘ) নোটিশ না দিয়ে সন্তান প্রসব করলেঃ
যদি কেউ নোটিশ
দেওয়ার আগেই সন্তান প্রসব করে ফেলেন,
তবে তিনি প্রমাণ দেখানোর ৩ কর্মদিবসের মধ্যে পুরো সময়ের টাকা এবং ছুটি একসাথে
পাওয়ার অধিকার রাখবেন।
৯.
সন্তান প্রসবের প্রমাণপত্র
সন্তান প্রসবের
প্রমাণ হিসেবে নিচের যে কোনো একটি জমা দেওয়া যাবেঃ
- জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর
অধীন জন্ম রেজিস্ট্রারের দেওয়া উদ্ধৃতি বা সনদ।
- কোনো রেজিস্টার্ড ডাক্তারের দেওয়া প্রত্যয়নপত্র।
- মালিকের কাছে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো প্রমাণপত্র।
- সন্তান প্রসবের পর অবশ্যই ৩ মাসের
মধ্যে প্রমাণপত্র
জমা দিতে হবে। যদি কেউ ৩ মাসের মধ্যে প্রমাণ না দেন, তবে তিনি আর
টাকা পাওয়ার অধিকারী থাকবেন না।
১০.
বিশেষ পরিস্থিতি (মৃত্যু বা গর্ভপাত)
- মায়ের মৃত্যুঃ
যদি সন্তান প্রসবের সময় বা পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে মা মারা যান:
- সন্তান বেঁচে থাকলে: যে
ব্যক্তি সন্তানের যত্ন নিচ্ছেন,
তিনি টাকা পাবেন।
- সন্তানও মারা গেলে: মৃত নারীর
মনোনীত ব্যক্তি (Nominee)
বা আইনি উত্তরাধিকারী টাকা পাবেন।
- গর্ভপাত (Miscarriage): গর্ভপাত হলে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা (টাকা) পাওয়া যাবে
না, তবে
শারীরিক কারণে ছুটির প্রয়োজন হলে তা অসুস্থতা বা অন্য ছুটি হিসেবে ভোগ করা
যাবে।
- চা-বাগান শ্রমিক: চা-বাগানের
শ্রমিকরা চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে হালকা কাজ করতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে তারা
প্রসূতি ভাতার পাশাপাশি কাজের মজুরিও পাবেন।
১১.
চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ সংক্রান্ত সুরক্ষা
- সন্তান প্রসবের পূর্ববর্তী ৬ মাস এবং পরবর্তী
৬০ দিন সময়ের
মধ্যে কোনো নারী শ্রমিককে বিনা কারণে চাকরি থেকে ডিসচার্জ, বরখাস্ত বা
অপসারণ করা যাবে না।
- যদি মালিক নোটিশ দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে এই সময়ে
চাকরিচ্যুত করেন, তবুও
ওই নারী তার প্রাপ্য প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না।