কর্মক্ষেত্রে ‘ইমপ্যাথি’ বা সহমর্মিতা: সফল এবং সুস্থ কর্মপরিবেশের চাবিকাঠি

বর্তমান কর্পোরেট বিশ্বে এবং কর্মক্ষেত্রে শুধুমাত্র কারিগরি দক্ষতা বা 'হার্ড স্কিল' থাকাই যথেষ্ঠ নয়। এর পাশাপাশি 'সফট স্কিল' বা মানবিক গুণাবলি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর এই সফট স্কিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শীর্ষে যার অবস্থান, তা হলো ইমপ্যাথি’ (Empathy) বা সহমর্মিতা

আজকের ব্লগে আমরা জানব কর্মক্ষেত্রে ইমপ্যাথি আসলে কী, কেন এটি জরুরি এবং কীভাবে আমরা এর চর্চা করতে পারি

ইমপ্যাথি বা সহমর্মিতা কী?

সহজ কথায়, ইমপ্যাথি হলো নিজেকে অন্যের অবস্থানে রেখে তার অনুভূতি, পরিস্থিতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা। এটি কেবল অন্যের প্রতি দয়া দেখানো বা সহানুভূতি (Sympathy) প্রকাশ করা নয়। সিম্প্যাথি হলো কারো দুঃখে দূর থেকে দুঃখিত হওয়া ("তোমার জন্য খারাপ লাগছে"), আর ইমপ্যাথি হলো সেই দুঃখটি নিজে অনুভব করার চেষ্টা করা ("আমি বুঝতে পারছি তুমি কেমন অনুভব করছ")

কর্মক্ষেত্রে এর অর্থ হলো—আপনার সহকর্মী, বস কিংবা অধস্তন কর্মীর মানসিক অবস্থা, কাজের চাপ এবং ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা

কর্মক্ষেত্রে ইমপ্যাথি কেন এত জরুরি?

১. দলীয় বন্ধন ও বিশ্বাস তৈরি:
যখন সহকর্মীরা বুঝতে পারেন যে তাদের অনুভূতি ও মতামতের মূল্য দেওয়া হচ্ছে, তখন দলের মধ্যে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। একটি শক্তিশালী টিম তৈরির ভিত্তিই হলো পারস্পরিক সহমর্মিতা

২. উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি:
গবেষণায় দেখা গেছে, সহমর্মী পরিবেশে কর্মীরা কাজের প্রতি বেশি অনুপ্রাণিত হন। মানসিক চাপ কম থাকলে এবং সাপোর্টিভ পরিবেশ পেলে কাজের মান ও গতি—উভয়ই বৃদ্ধি পায়

৩. মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা:
অতিরিক্ত কাজের চাপ, ডেডলাইন এবং ব্যক্তিগত সমস্যার জেরে কর্মীরা প্রায়ই 'বার্নআউট' বা মানসিক ক্লান্তির শিকার হন। সহমর্মী আচরণ এই মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং কর্মীকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখে

৪. নেতৃত্বের গুণাবলি:
একজন ভালো লিডার বা নেতা কেবল আদেশ দেন না, তিনি তার দলের সদস্যদের কথা শোনেন। যে লিডার যত বেশি এমপ্যাথেটিক, তার দল তত বেশি অনুগত এবং সফল হয়

কর্মক্ষেত্রে ইমপ্যাথি চর্চার ৫টি উপায়

ইমপ্যাথি কোনো জন্মগত জাদুর কাঠি নয়, এটি চর্চার মাধ্যমে অর্জন করা যায়। চলুন দেখে নিই কীভাবে:

১. মনোযোগ দিয়ে শোনা (Active Listening):
কারও কথা শোনার সময় আমাদের উদ্দেশ্য যেন কেবল উত্তর দেওয়া না হয়। সহকর্মী যখন কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন, তখন মোবাইল বা ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনুন। তাকে অনুভব করতে দিন যে আপনি সত্যিই তার কথাটি গুরুত্ব দিচ্ছেন

২. দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা:
তর্ক বা মতবিরোধের সময় চট করে রেগে না গিয়ে ভাবুন— "আমি যদি তার জায়গায় থাকতাম, তবে আমি কী করতাম?" অন্যের পারসপেকটিভ বা দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা অনেক বড় বড় সংঘাত এড়াতে সাহায্য করে

৩. বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শারীরিক ভাষা:
আপনার মুখের কথা সহমর্মী হতে পারে, কিন্তু আপনার ভঙ্গি যদি বিরক্তিকর হয় তবে তা কোনো কাজে আসবে না। কথা বলার সময় হাসিমুখে এবং উন্মুক্ত ভঙ্গিতে কথা বলুন

৪. ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেওয়া:
সব সময় কেবল কাজের কথা না বলে মাঝেমধ্যে সহকর্মীর ব্যক্তিগত ভালোমন্দের খোঁজ নিন। "আজ তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে, সব ঠিক আছে তো?"—এই ছোট প্রশ্নটিও অনেক বড় প্রভাব ফেলতে পারে

৫. নমনীয় হওয়া:
কারও ব্যক্তিগত জীবনে সমস্যা থাকলে (যেমন—অসুস্থতা বা পারিবারিক সংকট) কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো উচিত। এটি কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আরও বেশি দায়বদ্ধ করে তোলে

মনে রাখবেনঃ

ইমপ্যাথি বা সহমর্মিতা দুর্বলতা নয়, বরং এটি আধুনিক কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। রোবটের যুগে মানুষের মানবিক গুণাবলিই তাকে অনন্য করে রাখে। আসুন, আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রকে কেবল কাজের জায়গা না বানিয়ে, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর একটি মানবিক স্পেস হিসেবে গড়ে তুলি

আপনার আজকের আচরণই ঠিক করে দেবে আগামীকালের কর্মপরিবেশ কেমন হবে

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url