কাজ বন্ধ ও লে-অফকালীন পাওনা সম্পর্কে জানুন

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো (ধারা ১২, ১৬, ১৭ এবং ১৮) তে মূলত কারখানায় কাজ বন্ধ হওয়া, লে-অফ (Lay-off) এবং শ্রমিকদের পাওনা বা ক্ষতিপূরণ বিষয়ে বলা হয়েছে। মালিক বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে যেমন অগ্নিকাণ্ড, আকস্মিক দুর্ঘটনা, যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মহামারি, দাঙ্গা বা মালিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো কারনে প্রতিষ্ঠানের পুরো বা কোনো শাখা/বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত আইন কানুন মানিয়া চলিতে হবেঃ

কাজ বন্ধ রাখা (ধারা ১২):

  • এই ধারা অনুযায়ী মালিক বিশেষ কারণে কাজ বন্ধ করতে পারেন এবং শ্রমিকদের উপস্থিতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
  • নোটিশ প্রদান (উপ-ধারা ২, ৩ ও ৪): * কাজের সময়ের পরে বন্ধের সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী শিফট শুরুর আগে নোটিশ বোর্ডে জানাতে হবে
    • কাজের সময়ের মধ্যে হলে দ্রুত জানাতে হবে এবং সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে যে শ্রমিকদের কর্মস্থলে থাকতে হবে কি না এবং কাজ পুনরায় কখন শুরু হবে
  • কর্মস্থলে অবস্থানের মজুরি (উপ-ধারা ৫): যদি শ্রমিকদের কর্মস্থলে অবস্থান করতে বলা হয় এবং সেই সময় ১ ঘণ্টার বেশি হয়, তবে তারা অবস্থানের পুরো সময়ের জন্য মজুরি পাবেন। ১ ঘণ্টার কম হলে মজুরি নাও পেতে পারেন
  • মজুরি প্রদানের শর্ত (উপ-ধারা ৬ ও ৭):
    • যদি কাজ বন্ধের মেয়াদ ১ কর্ম দিবসের বেশি না হয়, তবে শ্রমিকরা কোনো মজুরি নাও পেতে পারেন (উপ-ধারা ৫ এর ক্ষেত্র ব্যতীত)
    • যদি মেয়াদ ১ কর্ম দিবসের বেশি হয়, তবে দ্বিতীয় দিন থেকে পরবর্তী সকল বন্ধ কর্মদিবসের জন্য শ্রমিকরা মজুরি পাবেন (বদলী বা সাময়িক শ্রমিক ব্যতীত)
  • লে-অফ ঘোষণা (উপ-ধারা ৮ ও ৯): * যদি কাজ বন্ধের মেয়াদ ৩ কর্ম দিবসের অধিক হয়, তবে শ্রমিকদের লে-অফ (Lay-off) করা হবে এবং তারা ধারা ১৬ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাবেন
    • এই লে-অফ কাজ বন্ধের প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হবে এবং প্রথম ৩ দিনের মজুরি লে-অফ ক্ষতিপূরণের সাথে সমন্বয় করা হবে 

লে-অফকৃত শ্রমিকগণের ক্ষতিপূরণের অধিকার (ধারা ১৬):

মালিক পক্ষ কোনো কারণে কাজ দিতে অসমর্থ হলে (লে-অফ করলে) শ্রমিকদের যেভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবেঃ

  • যোগ্যতাঃ যে শ্রমিকের নাম প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক রেজিস্টারে অন্তর্ভূক্ত আছে এবং যিনি মালিকের অধীনে অন্তত ৩ (তিন) মাস চাকরি পূর্ণ করেছেন, তিনি লে-অফকালীন ক্ষতিপূরণ পাবেন
  • ক্ষতিপূরণের হারঃ শ্রমিকের মোট মূল মজুরি (Basic), মহার্ঘ ভাতা এবং এডহক বা অন্তর্বর্তী মজুরি (যদি থাকে) এর অর্ধেক বা ৫০% এবং আবাসিক ভাতার (House Rent) সম্পূর্ণ বা ১০০% টাকালে-অফ কালীন সময় সাপ্তাহিক ছুটির দিনের জন্য কোন ক্ষতিপূরণ পাবে না।
  • বদলি শ্রমিকের ক্ষেত্রেঃ কোনো বদলি শ্রমিক যদি ওই প্রতিষ্ঠানে অবিচ্ছিন্নভাবে ১ (এক) বৎসর চাকরি পূর্ণ করেন এবং তার নাম প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক রেজিষ্টারে অন্তর্ভূক্ত থাকে, তবে তিনিও এই ধারার অধীনে লে-অফ সুবিধা পাবেন
  • সময়সীমা ও হারঃ একটি পঞ্জিকা বছরে প্রথম ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) দিন পর্যন্ত ৫০% বেসিক + ১০০% বাড়ি ভাড়া হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
    • যদি ৪৫ দিন পার হওয়ার পরও লে-অফের মেয়াদ আরও ১৫ দিন বা তার বেশি বাড়ানো হয়, তবে পরবর্তী সময়ের জন্যও ধারা ১৬(২) অনুযায়ী অর্থাৎ ৫০% বেসিক + ১০০% বাড়ি ভাড়া হারে ক্ষতিপূরণ বজায় থাকবে (যদি অন্য কোনো চুক্তি না থাকে)

ছাঁটাই প্রক্রিয়াঃ কোনো পঞ্জিকা বছরে প্রথম ৪৫ দিন লে-অফ করার পর যদি আরও অবিচ্ছিন্ন ১৫ দিন বা তার বেশি লে-অফ করতে হয়, তবে মালিক লে-অফের পরিবর্তে ধারা ২০ অনুযায়ী শ্রমিককে ছাঁটাই (Retrenchment) করতে পারেন

লে-অফকৃত শ্রমিকগণের রেজিস্টার (ধারা ১৭):

  • মালিককে লে-অফ হওয়া শ্রমিকদের জন্য একটি আলাদা রেজিস্টার  মেইনটেইন করতে হবে
  • লে-অফ থাকা অবস্থায় স্বাভাবিক কর্মসময়ে যারা কাজের জন্য হাজিরা দেবেন, তাদের নাম এই রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হবে
  • শর্ত থাকে যে, লে-অফ চলাকালীন ওই রেজিস্টারের বাইরে থেকে কোনো নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না 

যে ক্ষেত্রে লে-অফকৃত শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না (ধারা ১৮):

কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লে-অফ হওয়া শ্রমিক কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন নাঃ

  • বিকল্প কাজ গ্রহণে অস্বীকৃতিঃ যদি মালিক তাকে একই প্রতিষ্ঠানে বা ৮ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে মালিকের অধীনস্থ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে একই মজুরিতে কোনো বিকল্প কাজ দিতে চান এবং শ্রমিক তা করতে অস্বীকার করেন (যে কাজে বিশেষ কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই)
  • হাজিরা না দেওয়াঃ মালিকের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও যদি শ্রমিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মসময়ের মধ্যে দিনে অন্তত একবার কাজের জন্য হাজিরা না দেন
  • হাজিরার পর কাজ না পাওয়াঃ যদি শ্রমিক নির্ধারিত সময়ে হাজিরা দেন এবং হাজিরার ২ ঘণ্টার মধ্যে তাকে কোনো কাজ না দেওয়া হয়, তবে তিনি ওই দিনের জন্য লে-অফ হিসেবে গণ্য হবেন এবং ক্ষতিপূরণ পাবেন
  • পালার (Shift) পরিবর্তনঃ যদি কোনো শ্রমিককে শিফটের শুরুতে কাজ না দিয়ে ওই একই দিনে শিফটের দ্বিতীয়ার্ধে (দ্বিতীয় ভাগে) হাজিরা দিতে বলা হয় এবং তিনি হাজিরা দেন, তবে তিনি ওই দিনের অর্ধেক সময়ের জন্য লে-অফ এবং বাকি অর্ধেক সময়ের জন্য (কাজ দেওয়া হোক বা না হোক) চাকরিতে ছিলেন বলে গণ্য হবেন এবং পূর্ণ মজুরি পাবেন
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url