কর্মস্থলে 'অসদাচরণ' ও শাস্তির পদ্ধতিঃ শ্রম আইনে কি আছে?
আপনি কি জানেন কর্মস্থলে কোন কাজগুলো 'অসদাচরণ' হিসেবে গণ্য হয়? অথবা কোনো অসৎ আচরনের জন্য মালিক আপনাকে কীভাবে শাস্তি দিতে পারেন? বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২৩ ও ২৪ ধারা এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। চলুন সহজভাবে জেনে নিইঃ
কোন কাজগুলো 'অসদাচরণ'
(Misconduct)?
আইন অনুযায়ী নিচের কাজগুলো করলে একজন শ্রমিককে শাস্তির আওতায় আনা যায়ঃ
ক) কর্তৃপক্ষের আইনি ও যুক্তিসঙ্গত আদেশ অমান্য করা।
খ) চুরি, আত্মসাৎ, জালিয়াতি
বা প্রতারণা।
গ) চাকুরী সংক্রান্ত বিষয়ে ঘুষ গ্রহণ বা
প্রদান।
ঘ) বিনা ছুটিতে অনুপস্থিতি বা একটানা ১০ দিনের
বেশি অনুপস্থিতি।
ঙ) অভ্যাসগতভাবে দেরি করে কাজে আসা।
চ) প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য
কোন আইন, বিধি বা প্রবিধানের অভ্যাসগত লঙ্ঘন।
ছ) কারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি বা
অগ্নিসংযোগ করা।
জ)
কাজে চরম গাফিলতি দেখানো।
ঝ) মহাপরিদর্শক কর্তৃক
অনুমোদিত চাকুরী সংক্রান্ত, আচরণসহ বিধির যে কোন লঙ্ঘন।
ঞ) মালিকের অফিসিয়াল রেকর্ডের রদবদল, জালকরণ, পরিবর্তন, ক্ষতিকরণ
বা উহা হারাইয়া ফেলা।
শাস্তি
কী হতে পারে?
অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির ধরণ ভিন্ন হতে পারেঃ
- চাকুরী থেকে বরখাস্ত (Dismissal): বড়
কোনো অপরাধ বা ফৌজদারি অপরাধে সাজা পেলে সরাসরি বরখাস্ত করা যায়।
- অন্যান্য শাস্তিঃ অপসারণ, নিচের পদে নামিয়ে দেওয়া, পদোন্নতি বা
ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা, জরিমানা, অথবা
সর্বোচ্চ ৭ দিন বিনা মজুরিতে সাময়িক বরখাস্ত।
শাস্তি
দেওয়ার সঠিক আইনি পদ্ধতি (ধারা ২৪)ঃ
কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হলে অবশ্যই নিচের
নিয়মগুলো মানতে হবেঃ
১. শাস্তির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলীঃ
ধারা ২৩ অনুযায়ী
কোনো শ্রমিককে শাস্তি দিতে হলে নিচের ৫টি বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে:
- লিখিত অভিযোগঃ শ্রমিকের
বিরুদ্ধে অভিযোগটি অবশ্যই লিখিতভাবে হতে হবে।
- জবাব দেওয়ার সময়ঃ অভিযোগের
একটি কপি শ্রমিককে দিতে হবে এবং উত্তর দেওয়ার জন্য তাকে অন্তত ৭ দিন সময়
দিতে হবে।
- শুনানির সুযোগঃ শ্রমিককে
নিজের পক্ষ সমর্থন করে কথা বলার (শুনানির) সুযোগ দিতে হবে।
- তদন্ত কমিটিঃ মালিক ও
শ্রমিকের সমান সংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এই
কমিটি তদন্তের পর শ্রমিককে দোষী সাব্যস্ত করবেন। মনে রাখতে
হবে, তদন্ত ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
- অনুমোদনঃ মালিক বা ব্যবস্থাপক নিজে
বরখাস্তের আদেশটি অনুমোদন করতে হবে।
২.
সাময়িক বরখাস্ত ও ভাতাঃ
- তদন্ত চলাকালীন মালিক চাইলে ওই শ্রমিককে সাময়িকভাবে
বরখাস্ত (Suspend) রাখতে পারেন।
- এই সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদ সাধারণত ৬০ দিনের বেশি
হবে না (যদি না বিষয়টি আদালতে বিচারধীন থাকে)।
- বরখাস্তের আদেশটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
- সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন শ্রমিক 'খোরাকী ভাতা' (সাধারণত মূল মজুরির অর্ধেক) এবং
অন্যান্য সকল ভাতা (যেমন- বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা) সম্পূর্ণ
পাবেন।
৩.
তদন্তের সময় শ্রমিকের অধিকারঃ
- তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত শ্রমিক নিজের সহায়তার জন্য ওই
প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তার পছন্দের যেকোনো ব্যক্তিকে সাথে রাখতে পারবেন।
- তদন্তে যদি কেউ মৌখিক সাক্ষ্য দেয়, তবে অভিযুক্ত শ্রমিক তাকে পাল্টা প্রশ্ন বা জেরা করার সুযোগ
পাবেন।
৪.
তদন্তের ফলাফল ও মজুরিঃ
- যদি দোষী প্রমাণিত হয়ঃ শ্রমিককে
শাস্তি দেওয়া হলে তিনি সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ের জন্য কোনো বাড়তি মজুরি
পাবেন না, কেবল ওই সময়ে পাওয়া খোরাকী ভাতাই তার পাওনা থাকবে।
- যদি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ঃ তদন্তে দোষ
প্রমাণ না হলে ওই শ্রমিক সাময়িক বরখাস্তের সময়েও কর্মরত ছিলেন বলে গণ্য হবেন।
অর্থাৎ, খোরাকী ভাতার সাথে সমন্বয় করে তার ওই সময়ের পুরো
মজুরি মালিককে পরিশোধ করতে হবে।
৫. নোটিশ
ও দাপ্তরিক নিয়মঃ
- শাস্তির আদেশের একটি কপি অবশ্যই শ্রমিককে দিতে হবে।
- নোটিশ গ্রহণে অস্বীকারঃ যদি শ্রমিক
মালিকের দেওয়া কোনো চিঠি বা নোটিশ নিতে অস্বীকার করেন, তবে সেটি প্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দিলে এবং শ্রমিকের
ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলে তা 'শ্রমিক
পেয়েছেন' বলে ধরে নেওয়া হবে।
৬.
শাস্তির মাত্রা নির্ধারণঃ
মালিক যখন কোনো
শাস্তির সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন তাকে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবেঃ
- শ্রমিকের পূর্বের কাজের রেকর্ড বা নথিপত্র।
- অপরাধটি কতটা গুরুতর।
- প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের পূর্বের অবদান বা কৃতিত্ব।
- অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতি।
বাংলাদেশ
শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর বিধি ২৯ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ এবং দণ্ড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শাস্তি’ প্রদানের
বিস্তারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বাংলাদেশ
শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ এবং দণ্ড প্রাপ্তির ক্ষেত্রে
শাস্তি’ প্রদানের বিস্তারিত প্রক্রিয়া নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা
দেওয়া হলোঃ
১. কারণ
দর্শানোর জবাব ও তদন্তঃ
যখন কোনো
শ্রমিকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে, তখন মালিকপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show-cause
notice) দিবে। এর পরের ধাপগুলো হলোঃ
- জবাব সন্তোষজনক হলেঃ শ্রমিকের
দেওয়া জবাব যদি মালিকের কাছে সঠিক মনে হয়, তবে অভিযোগটি
সেখানেই শেষ হয়ে যাবে এবং এটি শ্রমিকের ভবিষ্যতে চাকরিতে কোনো নেতিবাচক
প্রভাব ফেলবে না।
- জবাব অসন্তোষজনক হলেঃ
জবাব সন্তোষজনক না হলে মালিক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।
- তদন্তের সময়সীমাঃ
তদন্ত কমিটি গঠন করে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে
রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
- দিন গণনাঃ এই ৬০ দিন গণনা শুরু হবে
অভিযোগ তোলার (শো-কজ) দিন থেকে অভিযোগটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত।
২. তদন্ত
কমিটির গঠন ও কার্যক্রমঃ
- সদস্য সংখ্যাঃ তদন্ত
কমিটিতে সর্বোচ্চ ৬ জন সদস্য থাকতে পারবেন।
- উপ-কমিটিঃ প্রয়োজনে মূল কমিটি একটি
উপ-কমিটি গঠন করতে পারে, যারা মূল কমিটির কাছে রিপোর্ট জমা
দেবে।
- চূড়ান্ত রিপোর্টঃ তদন্ত
কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে
পাঠাবে।
- মালিকের প্রতিনিধিঃ তদন্ত
কমিটিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের যেকোনো কর্মকর্তাকে মালিক
মনোনীত করতে পারেন।
৩.
শ্রমিকের প্রতিনিধি নির্বাচনঃ
- মনোনয়নঃ অভিযুক্ত শ্রমিক তার পক্ষে কথা
বলার জন্য ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন শ্রমিককে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করতে
পারেন।
- পদমর্যাদাঃ অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের চেয়ে
নিচের পদের কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করতে পারবেন না।
- ট্রেড ইউনিয়ন বা অংশগ্রহনকারী কমিটি থেকে প্রতিনিধি
মনোনয়নঃ যদি অভিযোগটি ধারা ২৩-এর আওতায় ৪ এর (খ) এবং
(ছ) [চুরি, আত্মসাৎ, জালিয়াতি বা প্রতারণা এবং কারখানায়
দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি বা অগ্নিসংযোগ করা] এর কারণে হয়, তবে শ্রমিক
চাইলে তার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের ট্রেড ইউনিয়নের কোনো সদস্যকে অথবা
(ট্রেড ইউনিয়ন না থাকলে) অংশগ্রহণকারী কমিটির কোনো শ্রমিক প্রতিনিধিকে বেছে
নিতে পারেন।
- কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপঃ যদি শ্রমিক
নিজে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিনিধি মনোনীত করতে না পারেন, তবে কর্তৃপক্ষ সিবিএ (CBA) বা অংশগ্রহণকারী
কমিটির কাছে প্রতিনিধি মনোনয়নের অনুরোধ জানাবে।
৪.
বিশৃঙ্খলা বা উশৃঙ্খলতার সংজ্ঞা
- আইনে বলা হয়েছে যে, শ্রমিকরা যদি
তাদের পাওনা আদায়ের জন্য কোনো নিয়মমাফিক কর্মসূচি পালন করেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটে না বা সম্পদের কোনো ক্ষতি হয়
না, তবে তাকে ধারা ২৩ অনুযায়ী 'উশৃঙ্খলতা'
বলা যাবে না।
সহজ
কথায়ঃ কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই লিখিত অভিযোগ দিতে হবে, জবাবের জন্য ৭ দিন
সময় দিতে হবে, সঠিক তদন্ত করতে হবে এবং তদন্ত চলাকালীন নিয়ম
অনুযায়ী ভাতা দিতে হবে। এই আইন
ও বিধির মূল উদ্দেশ্য হলো নিশ্চিত করা যেন কোনো শ্রমিককে অন্যায়ভাবে শাস্তি না
দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটিতে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের প্রতিনিধি থাকার বিধান রাখা হয়েছে
এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে
নির্দোষ প্রমাণিত হলে শ্রমিক তার বকেয়া সব বেতন পাওয়ার অধিকার রাখেন।